আইন জ্ঞান-প্রথম পর্ব

তাজ্যপুত্রঃ ইসলামে বা বাংলাদেশের আইনে মুসলিমদের জন্য  ‘তাজ্যপুত্র’ বলে কোন কিছু নেই, ‘তোকে তাজ্যপুত্র করলাম’ এ ধরনের ডায়লগের মুল্য কেবল বাংলা সিনেমায় আছে, বাস্তবে কোন সন্তানকে সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ন বঞ্চিত করতে চাইলে অভিভাবককে মৃত্যুবরন করার পূর্বেই হয় তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে ফেলতে হবে অথবা অন্য সন্তানদের দান করে যেতে হবে, আর এই দানটা হতে হবে অভিভাবকের জীবিতাবস্থায়। কোন অভিভাবক যদি জীবনকালে তার সব সম্পত্তি এই ভাবে বিক্রি বা দান না করেন তাহলে তার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি তার ‘তাজ্যপুত্র’ ইসলামী ফারায়েজ অনুযায়ীই পাবে। সেই সাথে আরো জেনে রাখা ভাল, সমস্ত ওয়ারিশের সম্মতি ব্যাতীত কোন মুসলিমের উইল/অসিয়ত তার সমস্ত সম্পত্তির কেবল এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কার্য্যকর।

দেনমোহরঃ কাবিন এবং স্ত্রী ‘সংসর্গ’ করার পর দেনমোহর এর পুরো টাকাই স্ত্রীর প্রাপ্য। সত্যিকার ইসলামী হিসাব মতে স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগেই দেনমোহর এর পুরো টাকা চুকিয়ে দেবার নিয়ম। জেনে রাখা ভাল স্ত্রী নিজে থেকে দাবী ছেড়ে না দিলে কোন অবস্থাতেই দেনমোহর এর টাকা মাফ হয়না। স্ত্রীর নিজে থেকে তালাক দেয়া, স্ত্রীর পরকীয়া, স্বামীকে যত্ন না করা, বাচ্চাদের খেয়াল না করা, কোন কিছুই দেনমোহর পরিশোধের দায়িত্ব থেকে স্বামীদের মুক্তি দেয়না। স্ত্রী যে কোন সময় পাওনা দেনমোহর দাবী করতে পারেন এবং তিনি তা দাবী করলে স্বামী তা পরিশোধে বাধ্য থাকবেন। তবে জেনে রাখা ভাল, তালাক হয়ে গেলে একটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে দেনমোহর এর টাকা চাইতে হয়, অন্যথায় দাবী তামাদি (এক্সপায়ার) হয়ে যাবে।

মায়ের সম্পত্তিঃ মুসলিম মেয়েরা মায়ের সম্পত্তি ছেলেদের চেয়ে বেশী পায়না, মেয়েরা মায়ের সম্পত্তি বেশী পায় এটা একটা সামাজিক বিশ্বাস মাত্র, এর কোন আইনী ভিত্তি নেই।

পিতা-মাতার সম্পত্তিঃ মুখে যতই বলা হোক না কেন, যতদিন বাবা-মা বেচে আছেন তাদের সম্পত্তি কেবল তাদেরই, সন্তানদের না, তাদের মৃত্যুর পর সন্তানরা ওয়ারিশ হিসেবে সম্পত্তি পাবার আশা করতে পারেন কিন্তু পিতা-মাতা জীবিত থাকাকালিন সময়ে সন্তানরা তাদের কাছ থেকে সম্পত্তি দাবী করতে পারে না, আইনে এ ধরনের দাবীর কোন অধিকার বা ভিত্তি নেই, সন্তানের আর্থিক অবস্থা যত খারাপই হোক না কেন, পিতা- মাতার জীবিতাবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর করা পিতা-মাতার দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। আরো জেনে রাখা ভাল, পিতা-মাতা তাদের সম্পত্তি কি করবেন বা কাকে দিয়ে যাবেন সেটা নিয়েও সন্তানদের কথা বলার কোন আইনগত অধিকার নেই।

তালাকের ক্ষমতাঃ  বাংলাদেশী আইনে ছেলেদের তালাকের ক্ষমতা ‘এবসলিউট’, এ জন্য ছেলেদের কোন কারন দর্শাতে হয়না। দবির যদি তার স্ত্রী জুলেখাকে তালাক দিতে চায় তাহলে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টও আইনগত ভাবে সেটা ঠেকাতে পারেন না। অপরদিকে কাবিনে মেয়েদের সাধারনত কিছু গ্রাউন্ড দেয়া থাকে যা হলে মেয়েরা তালাক দিতে পারেন, কাবিনে কিছু উল্লেখ না থাকলেও কোর্টে কেস করে মেয়ে অতি সহজে তালাক নিতে পারেন। তালাকের ব্যাপারে কোর্ট মেয়েদের প্রতি অতি মাত্রায় ‘পক্ষপাতিত্ব’ করে থাকে ;), জেনে রাখা ভাল, তালাক দিলে মেয়েরা কেবল তিন মাসের ভরন পোষন এবং অবশিষ্ট দেনমোহর এর টাকার অধিকারী হয়। স্বামীর সাথে যুক্তভাবে কোন কিছু কিনে না থাকলে স্বামীর সম্পত্তি থেকে আর কোন কিছু তারা পায়না।

আইন এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভিন্নতাঃ দেশী আইনে (আমি ইসলামী আইনের কথা বলছি না) দুজন প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত নরনারীর দৈহিক সম্পর্ক করা দন্ডার্হ নয়, অর্থাৎ এর কোন শাস্তি নেই। ধরা পরা ব্যাক্তিদের জোর করে বিয়ে দেবার বা ফাইন করার (যদি পাবলিক নুইসেন্স না থাকে) আইনগত অধিকার পুলিশের নেই। জেনে রাখা ভাল, বাংলাদেশের আইনে পরকিয়া বা ব্যাভিচারের জন্য মেয়েদের বিরুদ্ধে শাস্তির কোন ব্যাবস্থা নেই। কোন পুরুষ যদি কোন বিবাহিত নারীর সাথে তার স্বামীর সম্মতি ব্যাতীরকে (এজ ইফ) দৈহিক সম্পর্ক করে তাহলে আইনে সেই পুরুষটির শাস্তির বিধান আছে, মেয়েটার নেই  (পেনাল কোডের ধারাঃ ৪৯৭ দ্রষ্টব্য)

কোর্টে কেসঃ  কারো বিরুদ্ধে কোর্টে অভিযোগ করা মানেই সেটা আইনগত ভাবে প্রমান হয়ে যাওয়া না। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন মতে কোন অভিযোগ প্রমান করার দায়িত্ব কেবলমাত্র অভিযোগকারীর, ব্যাপারটা শুনতে যত সহজ মনে হয় বাস্তবে তা নয়। আদালত বিচার করে সাক্ষ্য প্রমান ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে, কি হওয়া উচিত, দেশ কি বলছে, সমাজ কি বলছে, টিভিতে টকশোতে কি বলছে, তাতে কোর্টের কিছুই যায় আসে না। যদি আসলেই অন্যায়-অত্যাচার হয়ে থাকে কেবল তাহলেই কোর্টে অভিযোগ করুন, ডালে লবন কম হওয়ায় যদি আপনার স্বামী আপনাকে থাপ্পর মেরে বসেন সেটা নিয়ে কোর্টে যৌতুক মামলা দায়ের করতে যাবেন না (থাপ্পর মারার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়), আর যদি যান তাহলে খাজনার চেয়ে বাজনা অনেক অনেক বেশী হয়ে যাবে। জেনে রাখা ভাল, কেস ‘পোক্ত’ করার জন্য আপনি যদি সত্যির সাথে মিথ্যা মেশান, ভাল সম্ভাবনা আছে আপনি কেস হেরে যাবেন। বাস্তব জীবনে উকিলেরা বাংলা ছবির উকিলদের মত আবেগী হয়না, কসাই যতখানি ‘মমতার’ সাথে গরু কাটে আপনার বিপক্ষ দলের উকিলও যে একই রকম ‘মমতার’ সাথে আপনার অভিযোগ কাটাকুটি করবেন, এই ব্যাপারটা মাথায় রাখলে আপনিই উপকৃত হবেন।

থানায় এজাহার/জিডিঃ সত্যি কথা বলতে আপনি যে কোন বিষয় নিয়ে থানায় জিডি করা যায়, এমনকি পোষা বেড়াল হারালে তা নিয়েও, তবে সব অভিযোগ কিন্তু আবার এজাহার হিসেবে থানায় লিপিবদ্ধ করা যায়না, কোন কোন অপরাধ এজাহার হিসেবে থানায় রেকর্ড হবে বাংলাদেশের আইনে তার একটা লিস্ট আছে, লিস্টে না পড়লে  অভিযোগ এজাহার হিসেবে থানায় নিবে না, প্রায় সময়ই আপনার এজাহারটি ‘এজাহার’ হিসেবে না নিয়ে ‘জেনারেল ডায়েরী’ হিসেবে নেয়াটা পুলিশের আইনী সীমাবদ্ধতা, পুলিশী শয়তানী না। জেনে রাখা ভাল থানা যদি আপনার বক্তব্য মতে এজাহার নিতে না চায় তাহলে আপনি একই বক্তব্য সম্বলিত অভিযোগ নিয়ে কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারেন।

টিপসঃ খুন-যখম টাইপ কিছু না হলে মুখে মুখে আপনার বিশাল কাহিনী শুনিয়ে থানার পুলিশদের উৎপাত করতে যাবেন না, বাংলাদেশে কেবল আপনি একা বাস করেন না, আরো অনেকেই থানায় মুখে মুখে তাদের সমস্যা বলতে আসেন। আপনি যদি আপনার বক্তব্য লিখে বা প্রিন্ট করে নিয়ে আসেন তাহলে ঝটপট থানা থেকে বের হতে পারবেন প্লাস থানার কোন কুতুব আপনার বক্তব্যকে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজানোর (সাংঘাতিক ক্ষতিকর!) সুযোগ পাবে না । অনেক সময় দেখা যাবে আপনি যা এজাহার মনে করছেন তা আসলে হবে জিডি বা থানা থেকে আপনাকে আরো কিছু বক্তব্য পরিষ্কার বা যোগ করতে বলা হতে পারে, তাই পেনড্রাইভে আপনার বক্তব্যের একটা সফট কপি রাখা একান্তই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর থানা যদি কুবুদ্ধি বশতঃ আপনার অভিযোগ রাখতেই না চায় তাহলে কোর্টে কেস দায়েরের বিকল্প ব্যাবস্থা তো আছেই।

ধন্যবাদ।

 

বাংলাদেশী আইনের সাধারন কিছু ইস্যু এবং প্রচলিত কিছু ভুল ধারনা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হয়েছে। এই সিরিজ সর্বপ্রথম আমার ব্যাক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে নোট আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। আশা করি তথ্যগুলি আপনাদের কাজে আসবে।

ধন্যবাদ।

কাজী ওয়াসীমুল হক।

হেড

ওয়াসীমুল হক এন্ড এসোসিয়েটস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *