বহুবিবাহঃ বাংলাদেশের আইন

বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ধারনা হচ্ছে_ ‘স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী আরেক বিয়ে করতে পারেনা’, বাংলাদেশের আইন আসলেই কি তাই বলে? আসুন সংশ্লিষ্ট আইনটিকে বিশ্লেষণ করা যাক।


মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (১৯৬১) এর ধারা ৬ এ বহুবিবাহ আলোচিত হয়েছে।

প্রচলিত ধারনা হচ্ছে এই আইন প্রথম স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাওয়া সংক্রান্ত, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, এই আইন দুই স্ত্রী থাকা অবস্থায় তৃতীয় স্ত্রী বা তিন স্ত্রী থাকা অবস্থায় চতুর্থ স্ত্রী গ্রহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় অনুমতি ছাড়া আরেক স্ত্রী গ্রহন করা যায়না কথাটা সত্য, তবে সেই অনুমতি কিন্তু সরাসরি সেই স্ত্রী বা স্ত্রীদের অনুমতি নয়, অনুমতিটা নিতে হয় সালিসী কাউন্সিলের।

তো এই ‘সালিসী কাউন্সিল’ কাদের দ্বারা গঠিত হয়? চেয়ারম্যান (এই প্রসঙ্গে পরে ব্যাখ্যা করছি), স্বামী এবং স্ত্রী (বা স্ত্রীদের) মনোনীত প্রতিনিধিদের দ্বারা।  স্বামী এবং প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে প্রতিনিধি দিতে পারেন।


বহুবিবাহের প্রসিডিওর নিম্নরূপ_

মনে করুন আমাদের টেস্ট সাবজেক্ট ‘চেরাগ আলি’ বিবাহিত, তার এক বা একাধিক স্ত্রী বর্তমান, যে কারনেই হোক না কেন সে আরেকটা বিয়ে করতে চায়, তার সামনে দুইটি পথ খোলা আছে, প্রথমতঃ সে বর্তমান স্ত্রী(দের) তালাক দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে ফেলতে পারে, তালাক সম্পর্কে আমার আগের লেখা থেকে আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন যে তালাক দিতে বাংলাদেশী পুরুষদের কোন প্রকার কারন দর্শাতে হয়না।

দ্বিতীয়তঃ সে একাধিক স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চাইতে পারে, সেক্ষেত্রে তাকে সালিসী কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে, তো এই সালিসী কাউন্সিলের অনুমতি সে কিভাবে নেবে?

উপরোক্ত আইনের ধারা ৬(২) বলে আমাদের বিবাহলিপ্সু চেরাগ আলি নির্দিষ্ট ফী সহ সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দফতরে দরখাস্ত করবেন, দরখাস্তে উল্লেখ থাকবে কি কারনে চেরাগ আলি আরেক বিয়ে করতে চান এবং সেই বিয়েতে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীগনের সম্মতি নেয়া হয়েছে কিনা।


(আমি জানি আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগছে শহরে আবার চেয়ারম্যান কোথায় পাব, এই বিষয়ে আইনের বক্তব্য নিম্নরূপ_

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা ২ (২) তে চেয়ারম্যানের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, এই আইনে চেয়ারম্যান বলতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, চেয়ারম্যানের কর্তব্য পালন করার জন্য সেনানিবাস এলাকায় সরকার কতৃক নিযুক্ত ব্যাক্তি বা বিশেষ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার জন্য সরকার নিযুক্ত ব্যাক্তিকে বোঝায়। চেয়ারম্যান কে হবেন বা হতে পারবেন সেটা নিয়ে এই আইনে আরো বিস্তৃত ব্যাখা দেয়া হয়েছে, যারা অধিকতর জানতে চান অনুগ্রহপূর্বক মূল আইনটা পড়ে নিবেন)


তো এইরূপ দরখাস্ত পাবার পর সেই চেয়ারম্যান কি করবেন? চেয়ারম্যান চেরাগ আলি এবং তার স্ত্রীকে (বা স্ত্রীগনকে) প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি দিতে বলবেন, সেই সব প্রতিনিধি আর চেয়ারম্যান মিলে হবে এক ‘সালিসী কাউন্সিল’, যা সিদ্ধান্ত নিবে চেরাগ আলি আরেকটা বিয়ে করতে পারবে কি পারবে না।

সালিসী কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়েটা প্রয়োজনীয়, ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিযুক্ত মনে করলে এবং যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে এমন সব শর্ত থাকলে (মানে আগের স্ত্রীদের ভরনপোষণ দেখভাল ইত্যাদি) তার উপর ভিত্তি করে সেই বিয়ের আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।  লক্ষ্য করুন, মঞ্জুর করতেই হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা কিন্তু নেই!


সালিসী কাউন্সিলকে অবশ্য তার সিদ্ধান্তের কারনসমূহ লিপিবদ্ধ করতে হবে, কি কারনে বিয়ের অনুমতি দেয়া হল বা হলনা তার ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করতে হবে,  তবে কোন পক্ষ যদি কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয় (চেরাগ আলি হতে পারে, তার স্ত্রীও হতে পারে), তারা তখন সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের নিকট পুনর্বিবেচনার জন্য দরখাস্ত দাখিল করতে পারবেন, বিয়ের অনুমতি দেয়া হবে কি হবেনা সেই বিষয়ে সেই সহকারী জাজের সিদ্ধান্তই চূরান্ত বলে গন্য হবে এবং তারপর আর কোন আদালতে এই প্রসঙ্গে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।


আর আমাদের চেরাগ আলি যদি সালিসী পরিষদের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে ফেলে তাহলে? তাহলে তাকে তার সকল আগের স্ত্রী এবং স্ত্রীগনের পাওনা দেনমোহরের টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে, না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে এবং দোষী সাব্যাস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে বা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডিত হবে।


এই হচ্ছে বহুবিবাহ সংক্রান্ত বাংলাদেশী আইন, তবে আইন ড্রাফটের প্রশ্নে বাঙ্গালী যে সর্ব যুগেই ‘লুথা’ টাইপ, বহুবিবাহ সংক্রান্ত এই আইন যে মাছের জালের মতই ফাক-ফোকর বিশিষ্ট, তার প্রমান দেখাচ্ছি_

  • এই আইনের ধারা ৬(৩) এ বলা হয়েছে চেয়ারম্যান স্বামী-স্ত্রী সবাইকে প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলবেন, কিন্তু কতদিনের মধ্যে এবং কিভাবে তা বলবেন বা বলতে হবে, তার বিন্দুমাত্র উল্লেখ এই আইনে নেই, কাজেই সেই চেয়ারম্যান যদি দরখাস্ত পাবার পর মাসের পর মাস এমনকি বছরও দরখাস্তটা জাস্ট ফেলে রাখেন, তাকে বাধ্য বা সাইজ করার জন্য কোন সহজ পদ্ধতি নেই, হ্যা, চেয়ারম্যানকে আইনত বাধ্য বা সাইজ করার আইনগত ব্যবস্থা আছে বটে, কিন্তু যে ঝামেলা, সময় আর টাকাপয়সা খরচ করে তা করতে হবে, তার চেয়ে আরেক বিয়ে করে সেই স্ত্রীর গর্ভে বাচ্চা জন্ম দিয়ে সেই বাচ্চা বড় ফেলাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আরো অনেক বেশী সহজ।
  • আবার ধরুন প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য চেয়ারম্যান স্বামী এবং স্ত্রীকে কতদিন সময় দিবেন, কবে থেকে সময় দিবেন, তারও কোন উল্লেখ এই আইনে নেই, কাজেই কথিত চেয়ারম্যান যদি কেবল ২-৩ দিন বা আরো কম সময় দেন, সেটা সম্পূর্ন বৈধ হবে।  আবার যেহেতু নোটিফিশনের জন্য কোন পন্থা এই আইনে নির্দিষ্ট করে বলা নেই, কাজেই সেই চেয়ারম্যান যদি কখনো পুরো প্রক্রিয়াকে বাইপাস করে (মানে না জানিয়ে) পরে দাবী করেন (সমর্থন বাই তার চ্যালা-চামুন্ডা) যে উনি চেরাগ আলির স্ত্রী(দের) মুখে মুখে জানিয়েছিলেন, সেই স্ত্রীদের কি করার থাকবে?
  • এবার আসি আরো সিরিয়াস প্রশ্নে, স্ত্রী বা স্ত্রীদের জানালো হল, কিন্তু তারা প্রতিনিধি পাঠালেন না, তখন করনীয় কি? চেয়ারম্যান ঝিম ধরে বসে আবার জানাবেন নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন? কেবল স্বামীর প্রতিনিধি আর চেয়ারম্যান মিলে কি বিয়ের অনুমতি দিয়ে দিতে পারেন? আইনে তো এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি!
  • সালিসী কাউন্সিল সিদ্ধান্ত কি unanimously নেবে নাকি simple majority ভিত্তিতে নেবে, এই আইনে তার কোন উল্লেখই নেই, আরো নেই কিসের ভিত্তিতে বা মানদণ্ডে সেই সালিসী কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ের কারনসমূহ  প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করবেন।
  • আবার ধরুন চেয়ারম্যান আর স্বামীর প্রতিনিধি মিলে একাধিক বিয়ে জাস্টিফাই করার জন্য সেইরাম সব কারন বানিয়ে বললো, স্ত্রীর প্রতিনিধি প্রতিবাদ করলো, প্রতিবাদগুলি লেখা হলনা, তখন করনীয় কি?
  • সালিসি কাউন্সিলের মতে অসন্তুষ্ট হলে সহকারী জাজ সাহেবের কাছে দরখাস্ত করার বিধান আছে, জাজ সাহেব তারপর হিয়ারিং করে সিদ্ধান্ত নিবেন নাকি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন, এ বিষয়ে আর কিছুই বলা হয়নি।

মোটের উপর বলা চলে যে পক্ষ বেশী শক্তিশালী সেই পক্ষই এই বিধানের সুবিধা নিজের পছন্দমত নিতে পারবে, বরপক্ষ যদি শক্তিশালী হয় তাহলে খুব সহজেই আরেক বিয়ে করে ফেলতে পারবে, কনেপক্ষ যদি শক্তিশালী হয় খুব সহজেই আরেক বিয়ের অনুমতি আটকে দিতে পারবে।

ভাবতেই অবাক লাগে এত টোটাফুটা আইন কিভাবে বানানো হয়েছিল আর কেন এত বছরেও কেউ এই আইনের ফাকগুলি ধরতে পারলেন না বা ধরলেন না!

লেখা শেষ করি এক মজার পয়েন্ট দিয়ে, যেহেতু প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে প্রতিনিধি দিতে পারবেন, কাজেই কারো যদি দুই স্ত্রী থাকে, তাহলে সেই স্ত্রীরা না চাইলে সেই লোক তৃতীয় বিয়ে করতে পারবেনা। ভোট সমান সমান ভাগ হয়ে স্ট্যান্ড স্টিল অবস্থা হবে, আর দুই এর বেশী স্ত্রী থাকলে তো কথাই নেই!

সারসংক্ষেপঃ একাধিক বিয়ে করার জন্য সালিসী কাউন্সিলের অনুমতি লাগে, সালিসী কাউন্সিল অনুমতি দিলে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াও একাধিক বিয়ে করা যায়। 

কাজী ওয়াসীমুল হক

হেড

ওয়াসীমুল হক এন্ড এসোসিয়েটস।

 

1 thought on “বহুবিবাহঃ বাংলাদেশের আইন”

  1. ব্রাদার, ফাঁকফোকর গুলি কি ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস এক্ট দিয়ে কভার করা সম্ভব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *