মানহানিঃ বাংলাদেশের আইন।

বাংলাদেশীদের মান-অপমান জ্ঞান বোঝা খুব কঠিন, কিসে যে তাদের মান আর কিসে তাদের অপমান, তা সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন। বক্তা এবং পরিস্থিতি ভেদে বাংলাদেশীদের মান-অপমান জ্ঞান আপ-ডাউন করে, হয়তো এ কারনেই প্রবাদ আছে_ ‘কর্তায় কইছে শালার ভাই, আনন্দের আর সীমা নাই’।

যাই হোক, বাংলাদেশে মানহানি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা যে খুব একটা দেখা যায়না তার অনেকগুলি কারনের মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশের মানহানি সংক্রান্ত আইনগুলি মোটের উপর জটিল, অন্তত অন্যান্য অনেক আইনের মত পড়েই চট করে বোঝা যায়না। জনগণের সুবিধার্থে এই লেখাতে আমি চেষ্টা করেছি মানহানি সংক্রান্ত আইনটিকে যতটা সম্ভব সহজ সরল করে পরিবেশন করতে, এখানে যেসব উদাহরন দেয়া আছে তা সব আমার নিজের তৈরী, মূল আইনটি লেখার শেষে দেয়া হয়েছে, আগ্রহীরা পড়ে নিবেন।


মানহানি বোঝার প্রথম ধাপ হচ্ছে মানহানির আইনী সংজ্ঞা জানা, এটাই স্টার্টিং পয়েন্ট, মানহানি হয়েছে বলে যে যতই লাফ-ঝাপ করুক না কেন, এই সংজ্ঞার ভেতর না আসলে কেস শুরু হবার আগেই তা শেষ হয়ে যাবে।

দন্ডবিধি ১৮৬০ সালের ধারা ৪৯৯ অনুসারে_

মৌখিক বা লিখিত বক্তব্য, ইশারা বা চিত্র দ্বারা কারো সম্মানের ক্ষতি করতে চেয়ে বা ক্ষতি হতে পারে জেনে বা ক্ষতি হবে বলে বিশ্বাস করার পরেও তা প্রকাশ করলে তা অত্র আইনে বর্নিত ব্যতিক্রমসমূহ বাদে মানহানি বলে গন্য হবে।

ধারাটা সহজ করে বললাম টু দি পয়েন্ট অনুবাদ করতে গেলে আরো অনেক খট্মটে হবে, তবে মূল বক্তব্য এটাই।

তো মান সম্মান কি কেবল নিজের জন্য আর বেচে থাকলে? নাহ, ব্যপারটা এত সরল নয়, মৃত ব্যাক্তিরও মান-সম্মান আছে, যদি এমন কোন কিছু প্রকাশ করা হয় যা বেচে থাকলে মৃত ব্যক্তির জন্য মানহানিকর হত বা যার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবার বা নিকটবর্তী আত্মীয়দের অনুভূতিকে আহত করা, তবে তাও মানহানির আওতায় আসবে।

মানহানি কিন্তু আবার ব্যাক্তিবিশেষের একচেটিয়া নয়, মানহানি কিন্তু কোন কোম্পানি, সংঘ বা বা দলেরও হতে পারে (জী! এর পর থেকে কোন রাজনৈতিক দলকে গালাগালি করার সময় এটা মনে রাখবেন)।

আপনি সাহিত্যিক? মাঝে মাঝে হাত চুলকায়, কি বোর্ডে ঝড় তুলে ফেলেন? একটু সাবধানে, ঘুরিয়ে কিছু বললে বা কৌতুক করে কিছু বললে সেটাও কিন্তু মানহানি বলে গন্য হতে পারে।


সংজ্ঞায় যাই থাকুক না কেন, আইন মানহানির মানহানির কয়েকটি পূর্বশর্ত দিয়েছে, যা পূরন না হলে আইনের চোখে তা মানহানি বলে গন্য হবেনা।

মানহানির শর্তসমূহঃ

ক) মানহানি বলতে এমন কিছু বোঝাতে হবে যা অন্যের চোখে আপনার জাতের বা পেশার নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার (যার সাথে দক্ষতাও জড়িত) মান কমিয়ে দেয়।

ব্যাখ্যাঃ নিজের চোখে আপনি কতখানি ‘অপমানিত’ হয়েছেন বা মনকলা খেয়েছেন তা কোর্টের কাছে বিবেচ্য নয়, এখানে জাতের কথা যা দেখছেন তা আসলে হিন্দুদের ‘জাত’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন ব্রাহ্মন, কায়স্থ ইত্যাদি, কাউকে জাত তুলে কথা বলা সেই সময় অত্যন্ত অপমানজনক বলে গন্য করা হত, এখন যেমন সরকারী কর্মচারীদের ঘুষখোর বললে মাইন্ড করে, সে যুগে তেমনি বামুনদের ‘চাল-কলা খেকো’ বললে মাইন্ড করতো। পেশা এবং নৈতিকতা নিচু করা বক্তব্য আপনারা বাংলাদেশে নিত্য নিত্য দেখেন, হয়তোবা সেভাবে লক্ষ্য করেননি। ‘কসাই, কমিশনখেকো ডাক্তার, এমবিবিএসরা আবার রুগী দেখতে পারে নাকি?’ এসব কখনো শুনেছেন? জী, এসবই মানহানির আওতায় আসে।

খ) যদি কারো বিশ্বাসযোগ্যতা কমানো হয়।

উদাঃ ওকে টাকা ধার দিয়েছ? তুমি শেষ!

গ) কারো দেহ ঘৃন্য বা সাধারনভাবে অগ্রহনযোগ্য অবস্থায় আছে এমন কোন কথা যদি কাউকে বিশ্বাস করানো হয়।

এই পয়েন্ট এখন আর পরিস্কার নয়, সম্ভবত সেই সময় কারো কুষ্ঠ বা যৌনরোগ বোঝাতে যেয়ে মানহানিকর কথাবার্তা বলা হত।


তবে একটা কথা, সংজ্ঞাতে পড়লেই যে মানহানি হবে তা কিন্তু নয়, মানহানি আইনের ১০ টি ব্যতিক্রম আছে, তার যেকোন একটিতে পড়লে সেটা আর মানহানি বলে গন্য হবেনা।

প্রথম ব্যতিক্রমঃ জনগণের স্বার্থে কোন সত্য প্রকাশ করলে তা মানহানি বলে গন্য হবেনা, তবে প্রকাশটা জনগনের স্বার্থে করা হয়েছে কিনা তা কোর্ট বিবেচনা করে দেখবেন।

উদাঃ মনে করুন কেউ মেয়েদের সাথে প্রেম করে বেড়ায়, পরে তাদের ন্যুড ছবি নিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে, কোন গ্রুপ যদি এই খবর সেই প্রতারকের নামধাম অপরাধের বিবরণ সহ প্রকাশ করে, তবে তা মানহানি বলে গন্য হবেনা, তবে মাইন্ড ইট, ঘটনা কিন্তু সত্য হতে হবে, পরে যদি দেখা যায় অভিযোগ সত্য নয়, খবর আছে!

দ্বিতীয় ব্যতিক্রমঃ সৎ বিশ্বাসে দেয়া কোন বক্তব্য, যা কোন সরকারী কর্মচারীর জনদায়িত্ব পালন সম্পর্কে বা সেই দায়িত্ব পালনের সাথে তার চরিত্র যতটুকু জড়িত তা নিয়ে করা হয়, মানহানি বলে গন্য হবেনা।

উদাঃ কোন সরকারী কর্মচারী যদি ব্যবহারের পর অভ্যাসগতভাবে টয়লেট ফ্লাস না করে, সে সম্পর্কে কিছু বললে তা মানহানি বলে গন্য হতে পারে (মাইন্ড ইট! টয়লেটে প্রকৃতির ডাকে সারা দেবার সময় তিনি কিন্তু কোন ‘জনদায়িত্ব’ পালন করছেন না), কিন্তু বিভিন্ন সরকারী অফিসে সরবরাহকৃত কমোডের মান রক্ষার যে দায়িত্ব উনার ছিল, তার মান সম্পর্কে যদি সৎ বিশ্বাসে কোন মতামত যদি আপনি প্রকাশ করেন, তা মানহানি বলে গন্য হবেনা। এটাও বলতে পারেন যে উনার স্বভাব ধীরে কাজ করা, আর আপনার কাছে যদি প্রমান থাকে, মানহানির ভয় বাদেই বলতে পারেন যে কমোড বাবদ উনি সাপ্লাইয়ারদের নিকট হতে কত করে কমিশন খেয়েছেন।

তৃতীয় ব্যতিক্রমঃ জনগুরুত্ব সম্পন্ন কোন বিষয় নিয়ে যিনি কোন কাজ করছেন, সেই বিষয়ে তার কাজ নিয়ে এবং সেই বিষয়ে তার চরিত্র যতটুকু জড়িত, সৎ বিশ্বাসে তা নিয়ে যেকোন মতামত প্রকাশ করা যায়।

উদাঃ মনে করুন দবির ‘খাল বাচাও’ আন্দোলনের নামে কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে নিয়মিত লেখালেখি করছে, আপনি মত প্রকাশ করতেই পারেন যে দবির এভাবে আসলে কাজ উদ্ধার করতে পারবে কিনা, এটাও আপনি বলতে পারেন যে দবির সাহেব এর আগেও কিছু কোম্পানির সাথে খোচাখুচি করে পরে মালপানি খেয়ে চুপ করে গেছে, কাজেই এবারও যে তেমন হবেনা তা বলা যায়না!

চতুর্থ ব্যতিক্রমঃ কোর্টের কার্য্যক্রম মোটের উপর সঠিক বা ফলাফল প্রকাশ করলে তা মানহানি বলে গন্য হবেনা।

উদাঃ বিচারের সময় কোর্ট যদি নির্দিষ্ট কোন ক্যাডারকে ‘বলদ’ বলে অভিহিত করে, সেটা সংবাদপত্রে প্রকাশ করলে তা মানহানি বলে গন্য হবেনা। অথবা যদি প্রকাশ করা হয় যে ধর্ষনের দায়ে দবিরের শাস্তি হয়েছে।

পঞ্চম ব্যতিক্রমঃ কোন মামলার রায়ের গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে বা সেই মামলার সাথে জড়িত কোন ব্যক্তি, স্বাক্ষী বা প্রতিনিধির মামলা সংক্রান্ত কার্য্যক্রম নিয়ে সৎ বিশ্বাসে যেকোন মন্তব্য করা যায়, তাদের চরিত্র নিয়েও করা যায়, যেটুকু সেই কেসের সাথে সম্পর্কিত।

উদাঃ জাজ সাহেব ৩ নং স্বাক্ষীর বক্তব্য ঠিক মত বিবেচনা করলে আজ এই রায় আসতো না, ২ নং স্বাক্ষী দবিরকে বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি, তার পেশাই হচ্ছে বিভিন্ন কেসে স্বাক্ষী দিয়ে বেড়ানো।

ষষ্ঠ ব্যতিক্রমঃ জনসাধারনের বিচার বিবেচনার জন্য সামনে যা পেশ করা হয়েছে এমন কোন কিছু সম্পর্কে বা রচয়িতার চরিত্র সম্পর্কে, যা তার কর্মে উঠে এসেছে তা নিয়ে সৎ বিশ্বাসে যেকোন মতামত প্রকাশ করা যেতে পারে।

কেউ যখন কোন বই প্রকাশ করেন, বা বকতৃতা দেন, বা গান গান, ধরে নেয়া হয় সেটা তিনি জনগণের মতামতের জন্য প্রকাশ করেছেন।

একজন বিখ্যাত লেখকের বই সম্পর্কে যদি আপনি মন্তব্য করেন যে কাহিনী ঢিলা, বাস্তবতাবোধবিহীন, তাহলে আপনি লেখকের মানহানি করছেন না, কারো গাওয়া গানকে যদি আপনি ‘রাসভ সঙ্গীত’ হিসেবে অভিহিত করেন তাহলেও করছেন না, কেউ একজন পতিতাপল্লী নিয়ে একটা বই লিখেছে, আপনি বললেন পতিতাপল্লী সম্পর্কে লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার কারনেই তিনি এমন একটা বই লিখতে পেরেছেন, চরিত্র নিয়ে টান দেয়া হল, কিন্তু মানহানি হলনা!

সপ্তম ব্যতিক্রমঃ আইনগতভাবে বা চুক্তিগত কারনে যারা অধীনস্থ, তাদের ভৎসনা করলে তা মানহানির মধ্যে আসবে না।

উদাহরনঃ বিচারক যদি কোন স্বাক্ষীকে তার কাজের জন্য, শিক্ষক ছাত্রকে, বস তার স্টাফকে, ম্যানেজার ক্যশিয়ারকে ভৎসনা করলে তা মানহানি হিসেবে গন্য হবেনা।

অষ্টম ব্যতিক্রমঃ সরল বিশ্বাসে কারো বিরুদ্ধে তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট করা অভিযোগ, যার বিষয়বস্তুর উপর সেই কতৃপক্ষের নিয়ন্ত্রন আছে, মানহানি বলে গন্য হবেনা।

উদাঃ কোন রেল অফিসারের বিরুদ্ধে রেল কতৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেয়া হল সে টিকেট প্রতি টাকা বেশী রাখে, মানহানি হবেনা, কিন্তু যদি এই অভিযোগ দেয়া হয় সে অফিস ছুটির পর মেয়েদের কলেজের সামনে মেয়ে দেখার জন্য ঘোরাঘুরি করে, সেটা এই ব্যতিক্রমে পড়বে না।

নবম ব্যতিক্রমঃ নিজ, অন্যের বা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সৎ বিশ্বাসে কারো চরিত্রে দোষারোপ করা মানহানির মধ্যে পড়েনা।

উদাহরনঃ দবিরকে টাকা ধার দিওনা, ও ফেরত দেয়না।

দশম ব্যতিক্রমঃ শ্রোতার, অন্য কারো বা জনগণের উপকারার্থে সৎ বিশ্বাসে কারো সম্পর্কে সতর্কবানী প্রদান করা মানহানির মধ্যে পড়েনা।

উদাহরনঃ দবির সাহেবকে বাড়ি ভাড়া দিতে যেওনা, পরে আর উঠাতে পারবেনা।


শাস্তিঃ মানহানির শাস্তি সর্বোচ্চ ২ (দুই) বছর কারাদন্ড বা জেল বা উভয়ই।

উল্লেখ থাকে যে অনলাইনে করা মানহানি সম্পর্কে ভিন্ন এবং কঠোরতর আইন আছে। উপরে যা কিছু পড়লেন তার সবই হল বাংলাদেশে প্রচলিত মানহানি আইনের সহজ ব্যাখ্যা, এই আইনের উপর কিছু কেস ল আছে, লেখা বড় এবং জটিলতর হয়ে যাবে দেখে সেটা আর এখানে দেয়া হল না।


ধন্যবাদ

কাজী ওয়াসীমুল হক

হেড

ওয়াসীমুল হক এন্ড এসোসিয়েটস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *