মুসলিম বিয়েঃ কাবিন এবং দেনমোহর

যেসব আইনী দিক সম্পর্কে সবার কম বেশী ধারনা থাকা প্রয়োজন, সেসবের মধ্যে একটি হচ্ছে বিয়ে এবং দেনমোহর সংক্রান্ত আইনসমূহ।

আমাদের মুসলিম সমাজে বিবাহ, বহুবিবাহ, তালাক এবং তার পরবর্তী ভরনপোষন নিয়ে বেশ কিছু ধারনা এবং ভুল বিশ্বাস প্রচলিত আছে।  সত্যি কথা বলতে এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি কেবল জনসমাজ নয় আমাদের আইনজীবীদের মধ্যেও আছে, বাজারে প্রচলিত আইনের বই সমূহে  এ সংক্রান্ত ভুল তথ্য আমি নিজেই দেখেছি।

কাজীদের বিয়ে পড়ানো দেখে যাই মনে হোক না কেন, মুসলিম বিয়ে সম্পাদন বা বৈধতার সাথে আসলে সূরা পড়া না পড়ার আদৌ কোন সম্পর্ক নেই।  ইসলাম ধর্মে যদিও বিয়ে ব্যাপারটাকে অত্যন্ত পবিত্র এবং সম্মানিত একটা ব্যাপার হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুসলিম আইন অনুসারে বিয়ে বিষয়টা জন্ম-জন্মান্তরের বাধন জাতীয় কিছু নয়, নেহায়াত একটি চুক্তি এবং (যদিও ইসলামে অত্যন্ত অপছন্দনীয় তারপরও) অন্য যেকোন চুক্তির মত এটাকেও ক্যান্সেল (এক্ষেত্রে তালাক) করা যায়।

মুসলিম বিয়ে বিষয়টা আসলে যেহেতু আসলে চুক্তি সম্পাদন, কাজেই চুক্তি করার সময় যেসব জিনিসের প্রতি নজর রাখা হয় মুসলিম বিয়েতেও ঠিক একই জিনিসের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়।

তো মুসলিম বিয়ের জন্য আসলে কি লাগে? প্রথমে লাগে বয়স, ছেলেদের কমপক্ষে ২১ আর মেয়েদের কমপক্ষে ১৮।  তারপর লাগে বিয়ে করার জন্য স্বাধীন ইচ্ছা এবং মত।

কেস নোটঃ কোনপ্রকার প্রতারনা, প্রলোভন বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আদায়কৃত বা প্রদানকৃত সম্মতি আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। স্পষ্ট কথায়, সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলযোগ্য (ডাঃ এ এল এম আবদুল্লাহ বনাম রোকেয়া খাতুন ১৯৬৯, ২১ ডিএলআর, ২১৩)

এবার আসি দেনমোহর প্রসঙ্গে, দেনমোহর কেবল কাবিনে লেখা একটা সংখ্যা নয়, এটা দিতে হয়, পাত্রীর চরিত্র কেমন, পাত্রী নিজে তালাক দিয়েছে কিনা, এসব কোন কিছুই দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়, আরো সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয় কোন মেয়ে যদি বিয়ের পর অন্য পুরুষের সাথেও পালিয়ে যায়, দেনমোহর তার ঠিকই প্রাপ্য।

কাবিনের ১৪ নং কলামে দেখবেন ‘দেন মোহরের কি পরিমান মুয়াজ্জল এবং কি পরিমান মু‘অজ্জল’ এই প্রশ্নটা আছে।  এখানে ‘মুয়াজ্জল’ (যে শব্দটা প্রথমে আছে) তার মানে হচ্ছে ‘তাৎক্ষনিক দেনমোহর’ আর ‘মু‘অজ্জল’ (যে শব্দটা পরে আছে) এর মানে হচ্ছে ‘বিলম্বিত দেনমোহর।

দেনমোহরের যে পরিমান ‘মুয়াজ্জল’ বা ‘তাৎক্ষনিক দেনমোহর’ সে পরিমান টাকা মহিলারা চাওয়া মাত্র স্বামীর কাছ থেকে বুঝে পাবার হকদার, চাওয়া মাত্র স্বামী যদি সেই পরিমান টাকা পরিশোধ না করেন বা করতে না পারেন, তাহলে মহিলারা সেই পরিমান টাকা বুঝে পাবার আগ পর্যন্ত স্বামীর সাথে বসবাসে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, দেনমোহরের মুয়াজ্জল অংশ স্বামী পরিশোধ না করলে বা করতে ব্যার্থ হলে কোর্ট স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে বলবে না।

আর দেনমোহরের যে পরিমান টাকা ‘মু‘অজ্জল’ সেটা স্বামী দিতে না চাইলে কেবল মাত্র কয়েক অবস্থায় স্ত্রীরা সেই পরিমান টাকা বুঝে পাবার অধিকার রাখেন। প্রথমতঃ স্বামীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে, দ্বিতীয়তঃ বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং তৃতীয়তঃ স্বামী আরেক বিয়ে করে ফেললে।

দেনমোহর চাওয়ার পর স্বামী তা দিতে অস্বীকার করলে যদি স্ত্রীরা মামলার মাধ্যমে তা আদায় করতে চান, তবে সেটা করতে হবে দেনমোহর প্রদানে অস্বীকারের বা স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে, না হলে মামলা করার অধিকার তামাদি (এক্সপায়ার) হয়ে যাবে, তবে এখানে একটা কিন্তু আছে, স্ত্রী যদি বিলম্বে মামলা করার কারন দর্শিয়ে আবেদন করেন, নিতান্তই গাজাখুরী কোন কারন না হলে কোর্ট মহিলাদের তিন বছর পরেও মামলা করার অনুমতি প্রদান করেন।

মেয়েরা ইচ্ছা করলে দেনমোহরের টাকা মাফ করে দিতে পারেন সত্য, কিন্তু সেটা হতে হবে কেবল মেয়ের নিজের ইচ্ছায়।  বাসর রাতে ব্রীড়াবনত বধূর কাছ থেকে স্বামী পিড়াপীড়ি করে যে মাফ আদায় করে নেয় বা স্বামী মারা যাবার পর যে অন্যরা মৃত স্বামীর পক্ষে শোকাভুত বিধবার নিকট হতে যে মাফ আদায় করে নেয়, তখন মাফ দেয়া হলেও আইনের চোখে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কেস নোটঃ স্বামীর পিড়াপীড়ি দেনমোহর মাফ করে দিলে সেটা আসলে মাফ হয়না, স্ত্রী সেটা আবার দাবী করতে পারেন (শাহ বানু বেগম বনাম ইফতেখার মোহাম্মদ খান ১৯৫৬, ৮ ডিএলআর ডব্লিউ, পি, করাচী ১৩৩)

মুরুব্বীরা দেন মোহরের টাকা নিয়ে ফোপর দালালী করলেও দেনমোহর কত হবে সেটা নির্ধারন করার হক আসলে একমাত্র পাত্রীর এবং এটা বুঝে পাবার হকও কেবল তার।

মনে রাখলে ভাল করবেন দেনমোহরের দায় একান্ত ভাবেই পাত্রের ব্যাক্তিগত আর্থিক দায়, পাত্রের পিতা বা অন্য কারো নয়।

ধন্যবাদ

 

কাজী ওয়াসীমুল হক।

হেড

ওয়াসীমুল হক এন্ড এসোসিয়েটস। 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *